বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বড় ও মাঝারি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এসইও-তে বিপুল বিনিয়োগ করলেও অর্গানিক সেলস বৃদ্ধিতে অনেকেই ব্যর্থ হচ্ছেন। মূলত সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং কিছু মৌলিক টেকনিক্যাল ভুলই এর প্রধান কারণ।
অর্গানিক রিচ ও বিক্রয় কমে যাওয়ার মূল কারণসমূহ:
- কি-ওয়ার্ড রিসার্চের অভাব: ব্যবহারকারীর চাহিদা না বুঝে কেবল অনুমানের ভিত্তিতে কাজ করা।
- কপি করা কন্টেন্ট: অন্যের সাইট থেকে প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন হুবহু কপি করে ব্যবহার করা, যা র্যাঙ্কিং নষ্ট করে।
- টেকনিক্যাল এসইও অবহেলা: সাইট স্পিড, মোবাইল-ফ্রেন্ডলিনেস এবং ইনডেক্সিং সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব না দেওয়া।
২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে এই ভুলগুলো দ্রুত শুধরানো প্রয়োজন। ঠিক কোন ভুলগুলো আপনার অনলাইন ব্যবসায় সফলতার ক্ষতি করছে এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান করবেন, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. অগোছালো অনলাইন স্টোরের কাঠামো (Poorly Structured Online Stores)
ভুল সাইট আর্কিটেকচার: আপনার ই-কমার্স বিক্রয় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ । অনেক ই-কমার্স উদ্যোক্তা ব্যবসার শুরুর দিকে ওয়েবসাইটের কাঠামোর (Site Structure) দিকে নজর দেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী এলোমেলোভাবে পেজ যোগ করার ফলে সাইটটি দ্রুত একটি জটিল এবং অগোছালো নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। এর ফলে গুগল বট (Googlebot) সাইটের ইউআরএল ক্রল করতে বাধার সম্মুখীন হয় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ পেজ ইনডেক্স হওয়া থেকে বাদ পড়ে যায়।
উদাহরণ: ধরুন, আপনি “স্মার্টফোন এক্সেসরিজ” ক্যাটাগরিকে সাজালেন এভাবে: হোম > ইলেকট্রনিক্স > মোবাইল > ব্র্যান্ড X > স্মার্টফোন > এক্সেসরিজ এই অতিরিক্ত গভীর বা জটিল নেভিগেশনের কারণে গুগল বট শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে আপনার পণ্যগুলো সার্চ রেজাল্টে আসে না এবং স্বাভাবিকভাবেই বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশী বাজারের প্রেক্ষাপট ও মোবাইলের গুরুত্ব
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
- ২০২৪ সাল নাগাদ: বাজারের আকার প্রায় ৬,৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- ২০২৯ সাল নাগাদ: এটি ১২,৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিশাল কেনাকাটার প্রায় ৮০% সম্পন্ন হয় মোবাইল ফোন থেকে। যখন আপনার সাইটের নেভিগেশন জটিল হয়, তখন মোবাইল ব্যবহারকারীরা বিরক্ত হয়ে সাইট ছেড়ে চলে যান। গুগল যখন দেখে আপনার সাইটে বাউন্স রেট (Bounce Rate) বেশি এবং নেভিগেশন ত্রুটিপূর্ণ, তখন আপনার র্যাঙ্কিং কমিয়ে দেয়।
উদ্যোক্তাদের করণীয়: যারা বাংলাদেশে অনলাইনে সফল ব্যবসা করতে চাইছেন, তাদের জন্য সাইট আর্কিটেকচার নিয়ে নতুন করে ভাবা জরুরি। পণ্য সহজে খুঁজে পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং ক্রেতার নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাই (User Experience) আপনার অর্গানিক ট্রাফিক ও বিক্রয় বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
২. দুর্বল বা ফাঁকা ক্যাটাগরি পেজ (Weak or Empty Category Pages)
একটা ফ্যাশন ই-কমার্স সাইটে “পুরুষদের টি-শার্ট” ক্যাটাগরি পেজে দেখাঁ যায় শুধুই টি-শার্টের ছবি আর দাম দেওয়া। আর কিছু নেই! কোনো বর্ণনা নেই, কোন ব্র্যান্ডের টি-শার্ট পাওয়া যায় বা কী ধরণের ফ্যাব্রিক ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়েও কিছু লেখা ছিল না। এটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন দোকানে দারুণ সব টি-শার্ট আছে, কিন্তু আর কিছু নেই। গুগলও এমন খালি পেজকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। ফলস্বরূপ, যখন কেউ “পুরুষদের টি-শার্ট” লিখে খুঁজছিল, তখন তাদের সাইটটা সার্চ রেজাল্টে আসছিলই না। এটা ব্যবসার একটা বড় সুযোগ কিন্তু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল! এটা অনেকটা আপনি আপনার দোকানে নতুন পণ্য আনলেন, কিন্তু প্রচারণার অভাবে কেউ জানলোই না।
আসলে, আমাদের দেশের অনেক ই-কমার্স সাইটেই এই ভুলটা দেখা যায়। ক্যাটাগরি পেজগুলোকে তারা স্রেফ পণ্যের একটা তালিকা হিসেবে দেখে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনা, কন্টেন্ট বা ব্যবহারকারীর জন্য সহায়ক কোনো তথ্য রাখে না। এমন দুর্বল বা ফাঁকা পেজগুলো সার্চ ইঞ্জিনের কাছে ‘পাতলা কন্টেন্ট’ (thin content) হিসেবে চিহ্নিত হয়। গুগল যখন দেখে একটা পেজে তেমন কোনো দরকারি তথ্য নেই, তখন সেটাকে কম মূল্যবান মনে করে। এতে করে আপনার সাইটের র্যাঙ্কিং কমে যায়, অর্গানিক ট্রাফিক কমে যায়, আর গ্রাহকরাও দ্রুত সাইট থেকে বেরিয়ে যান (উচ্চ বাউন্স রেট)। এমন ‘পাতলা কন্টেন্ট’-এর জন্য একটা সাইটের অর্গানিক ট্রাফিক ৭০% পর্যন্ত কমে যায়!
এমন ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্যাটাগরি পেজের জন্য সুন্দর, ইউনিক বর্ণনা লিখতে হবে। সেখানে পণ্যের ধরণ, বৈশিষ্ট্য, গ্রাহকের জন্য কী সুবিধা এসব বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড (যেমন: ‘সেরা ল্যাপটপ ২০২৩’, ‘সস্তা শীতের পোশাক ঢাকা’) ব্যবহার করলে গুগল আপনার পেজটিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে। শুধু টেক্সট নয়, ইন্টারনাল লিংকিংগুলোও ঠিকঠাক থাকতে হবে।
তবে এই বিষয়টা একটু কষ্টসাধ্য মনে হতে পারে। প্রতিটি ক্যাটাগরির জন্য আলাদা করে বিস্তারিত লেখা, কিওয়ার্ড খুঁজে বের করা এসবের জন্য সময় ও মনোযোগ দুটোই লাগে। অনেক সময় ই-কমার্স মালিকরা মনে করেন, শুধু পণ্যের ছবি দেখালেই বুঝি কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু, আমার মনে হয়, এতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিটাই বেশি হয়।
যদি আপনি আপনার ই-কমার্স সাইটের ট্রাফিক বাড়াতে চান এবং গ্রাহকদের জন্য সুন্দর অভিজ্ঞতা দিতে চান, তাহলে প্রতিটি ক্যাটাগরি পেজে তথ্যপূর্ণ কন্টেন্ট যোগ করাটা আপনার জন্য খুবই জরুরি।
৩. ডুপ্লিকেট বা দুর্বল পণ্যের বর্ণনা (Duplicate or Poor Product Page Content)
ই-কমার্স সাইটে ডুপ্লিকেট কন্টেন্ট বা হুবহু বর্ণনা ব্যবহার করা একটি নীরব ঘাতক। একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে—একটি ইলেকট্রনিক্স সাইটে একই মডেলের হেডফোনের পাঁচটি ভিন্ন রঙের জন্য পাঁচটি আলাদা পেজ ছিল। প্রতিটি পেজের বর্ণনা ছিল হুবহু এক। ফলাফল? গুগল বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে কোন পেজটিকে গুরুত্ব দেবে (Authoritative Page)। এর ফলে কোনো পেজই আশানুরূপ র্যাঙ্কিং পাচ্ছিল না।
বাংলাদেশে অনেক ই-কমার্স উদ্যোক্তা প্রস্তুতকারকের দেওয়া বর্ণনা বা প্রতিযোগীর সাইট থেকে কন্টেন্ট কপি করেন। বিশেষ করে যখন একটি পণ্যের একাধিক ভ্যারিয়েন্ট (রঙ বা সাইজ) থাকে, তখন সবগুলোর জন্য একই বর্ণনা ব্যবহার করায় সাইটে ডুপ্লিকেট পেজের সংখ্যা বেড়ে যায়।
সমাধান: ইউনিক ডেসক্রিপশন ও ক্যানোনিকাল ট্যাগ
আমরা যখন প্রতিটি ভ্যারিয়েন্টের জন্য আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বর্ণনা তৈরি করলাম অথবা Canonical Tag ব্যবহার করে একটি ‘মাস্টার পেজ’ নির্দিষ্ট করে দিলাম, তখনই গুগল আসল পেজটি চিনতে পারলো এবং র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি দেখা দিল।
কাস্টমার ট্রাস্ট ও বর্তমান বাজারের বাস্তবতা
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ২০২৪ সালে ৬,৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু এই সম্ভাবনার মাঝে বড় বাধা হলো গ্রাহকের আস্থার সংকট। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে:
- ৬০.৪% ক্রেতা পণ্য ফেরত দেন শুধুমাত্র ‘অসঠিক বর্ণনা বা ছবির সাথে অমিল’ থাকার কারণে।
- ২২% গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে প্রাপ্ত পণ্যের সাথে বর্ণনার কোনো মিল ছিল না।
ডুপ্লিকেট কন্টেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা থেকেই এই আস্থার সংকট তৈরি হয়। একই বর্ণনা বারবার ব্যবহারে পণ্যের সঠিক ও ইউনিক তথ্য আড়ালে পড়ে যায়, যা ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে।
সার্চ ইঞ্জিনে এর নেতিবাচক প্রভাব
গুগল ডুপ্লিকেট কন্টেন্ট পছন্দ করে না। এটি শুধু আপনার র্যাঙ্কিংই নষ্ট করে না, বরং আপনার সাইটের মূল্যবান Crawl Budget-ও অপচয় করে। হাজার হাজার পণ্য থাকা সাইটের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
উপসংহার: ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে ইউনিক কন্টেন্ট এবং সঠিক Canonical Strategy-র কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু গুগলকে সন্তুষ্ট করবে না, বরং ক্রেতাদের সঠিক তথ্য দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার বিক্রয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
৪. ফিল্টার এবং ভ্যারিয়েন্ট পেজের অতিরিক্ত ইনডেক্সিং (Overindexing Filter and Variant Pages)
ই-কমার্স সাইটে ইউজার এক্সপেরিয়েন্স (UX) উন্নত করতে ফিল্টার বা Faceted Navigation অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু সঠিকভাবে ম্যানেজ না করলে এই ফিল্টারগুলোই এসইও-র জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের অনেক বড় ই-কমার্স সাইট এই একটি জায়গায় মারাত্মক ভুল করে থাকে।
উদাহরণ: একটি বড় গ্রোসারি সাইটে কাজ করার সময় দেখা গেল, তাদের ব্র্যান্ড, দাম, ওজন বা উৎপত্তির দেশ অনুযায়ী তৈরি করা হাজার হাজার ফিল্টার পেজ গুগল ইনডেক্স করার চেষ্টা করছে। Noindex বা Canonical ট্যাগ ব্যবহার না করায় তৈরি হয়েছে লক্ষ লক্ষ অপ্রয়োজনীয় ইউআরএল (URL)। এর ফলে “চাল” বা “ডাল”-এর মতো মূল ক্যাটাগরি পেজগুলো তাদের গুরুত্ব হারাচ্ছিল এবং সাইটম্যাপ অস্বাভাবিক বড় হয়ে ইনডেক্সিং প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছিল।
কেন এটি আপনার ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর?
১. ক্রল বাজেট (Crawl Budget) অপচয়: এই ধরনের ডাইনামিক পেজগুলো গুগলের বটকে বিভ্রান্ত করে। বট আপনার গুরুত্বপূর্ণ পেজগুলো বাদ দিয়ে কম মূল্যবান ফিল্টার পেজগুলো ক্রল করতে বেশি সময় নষ্ট করে। ২. ইনডেক্স ব্লট (Index Bloat): অপ্রয়োজনীয় পেজ দিয়ে গুগল ইনডেক্স ভরে যাওয়াকে ইনডেক্স ব্লট বলে। এটি সাইটের সামগ্রিক অথোরিটি কমিয়ে দেয়।
৩. আন-অপ্টিমাইজড ইউআরএল প্যারামিটার: বাংলাদেশে ই-কমার্স সাইটগুলোতে এটি একটি সাধারণ ভুল। ৮০% কেনাকাটা মোবাইল থেকে হওয়ায়, জটিল ইউআরএল স্ট্রাকচার লোডিং স্পিড এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্সেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের বাজারের প্রেক্ষাপটে করণীয়
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ২০২৪ সালেই প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বিশাল বাজারে টিকে থাকতে হলে টেকনিক্যাল এসইও-তে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
সমাধান:
- অপ্রয়োজনীয় ফিল্টার পেজগুলোতে Noindex এবং Nofollow ট্যাগ ব্যবহার করুন।
- প্রধান পেজটিকে নির্দিষ্ট করতে সঠিক Canonical Tag প্রয়োগ করুন।
- অপ্রয়োজনীয় প্যারামিটারগুলো গুগল সার্চ কনসোলে হ্যান্ডেল করুন।
৫. স্ট্রাকচার্ড ডেটার অভাব (Lack of Structured Data (Schema Markup))
একটা ই-কমার্স সাইটের জন্য স্ট্রাকচার্ড ডেটা বা স্কিমা মার্কআপ (structured data) হলো এক দারুণ কৌশল। অনেকটা গুগলকে আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে একটা ধারনা দেওয়া। আপনি যখন গুগলে সার্চ করেন আর দেখেন কিছু সার্চ রেজাল্টে পণ্যের রেটিং, দাম, বা স্টক আছে কিনা, এমন সব তথ্য সরাসরি দেখাচ্ছে, তখন আপনার চোখ ঠিক সেগুলোর দিকেই যায়।
একটি অনলাইন বইয়ের সাইটে প্রোডাক্ট স্কিমা মার্কআপ ব্যবহার করেছিলাম। এরপর এই তথ্যগুলো সার্চ রেজাল্টে যোগ হতেই, গুগল থেকে তাদের ওয়েবসাইটে ক্লিক করার হার (CTR) অনেকটা বেড়ে গেল। এটা সাইটকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
সাধারণভাবে বলা হয়, স্কিমা মার্কআপ ব্যবহার করলে সার্চ রেজাল্টে ক্লিক-থ্রু রেট (CTR) ৩০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত বাড়ে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ৪০% এর বেশিও হতে পারে। আর শুধু CTR নয়, যে সাইটগুলো স্কিমা ব্যবহার করে, তারা প্রায় চারগুণ বেশি ‘রিচ স্নিপেটস’ (rich snippets) দেখাতে পারে। বাংলাদেশেও কিন্তু এর প্রভাব দেখা যায়। যেমন, ‘ওমেগা মার্ট বিডি’ নামের একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম স্ট্রাকচার্ড ডেটা ব্যবহার করে তাদের সার্চ ভিজিবিলিটি অনেক বাড়িয়েছিল। বাংলাদেশে এখন ডিজিটাল পণ্যের বাজার অনেক বড় হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় US$9.2 বিলিয়ন ছুঁয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীও বাড়ছে, ২০২৫ সালের শুরুতে প্রায় ৭৭.৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিলেন। এর মানে হলো, স্কিমা মার্কআপ ব্যবহার করে আপনি দেশের বিশাল সংখ্যক মোবাইল ব্যবহারকারী (যেখানে ৮০% ই-কমার্স লেনদেন মোবাইল থেকে হয়) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন। Product, Offer, AggregateRating, BreadcrumbList, Organization এর মতো স্কিমাগুলো ই-কমার্সের জন্য খুবই দরকারি।
তবে সমস্যা হলো, আমাদের দেশের অনেক ই-কমার্স সাইট হয়তো এই স্ট্রাকচার্ড ডেটা ব্যবহারই করে না, বা ভুলভাবে ব্যবহার করে। তখন তাদের দারুণ সব প্রোডাক্টগুলো সার্চ রেজাল্টে একদম সাধারণ লেখা হিসেবে দেখায়, এটা অনেকেই দেখতে পায় না।
যদি আপনি আপনার ই-কমার্স প্রোডাক্টগুলোকে গুগলে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে দেখাতে চান, আরও বেশি ক্লিক পেতে চান এবং আপনার ব্যবসার বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চান, তাহলে স্ট্রাকচার্ড ডেটা ব্যবহার করা আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৬. সার্চ ইনটেন্টের সাথে কন্টেন্টের অসামঞ্জস্য (Misaligned Content with Search Intent)
যখন আপনি অনলাইনে কিছু খুঁজতে গিয়ে ঠিক যে তথ্যটা চাচ্ছেন, সেটা পেয়ে যান – সেই অনুভূতিটা দারুণ! গ্রাহকদের এমন একটা অভিজ্ঞতা দেওয়াটাই আসলে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
যারা দারুণ সব বিউটি প্রোডাক্ট বিক্রি করতেন। কিন্তু তাদের একটা বড় সমস্যা ছিল – “ত্বকের যত্নের রুটিন” বা এই ধরনের তথ্যমূলক সার্চ টার্মের জন্য তাদের সাইট কখনোই ভালো র্যাঙ্ক করছিল না। ব্যাপারটা এমন ছিল, আপনি হয়তো খুঁজছেন “সকালে কিভাবে ত্বকের যত্ন নেব?”, আর আপনি গিয়ে পৌঁছাচ্ছেন শুধু একটা ক্রিমের প্রোডাক্ট পেজে! সেখানে ক্রিমটার দারুণ সব গুণাগুণ লেখা আছে, কিন্তু আপনার মূল প্রশ্ন, অর্থাৎ কিভাবে একটা সম্পূর্ণ রুটিন বানাবেন, সেটার কোনো উত্তর নেই।
কাস্টমাররা হয়তো শুধু প্রোডাক্ট কিনতে আসেনি, তারা প্রথমে তথ্য খুঁজছে, সমাধান খুঁজছে। তাই আমরা একটা ভিন্ন পথ ধরলাম। আমরা “সকালে ও রাতে ত্বকের যত্নের সহজ রুটিন” নামে একটি ব্লগ পোস্ট তৈরি করলাম। সেখানে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেওয়া হলো কিভাবে একটি কার্যকর রুটিন তৈরি করা যায়, আর সেই রুটিনের প্রতিটি ধাপে তাদের প্রাসঙ্গিক প্রোডাক্টগুলো লিংক করে দিলাম। এই তথ্যপূর্ণ কন্টেন্টটি প্রচুর মানুষকে তাদের সাইটে নিয়ে এলো, যারা প্রথমে শুধু জানতে এসেছিল, কিন্তু পরে তাদের মধ্যে অনেকেই ক্রেতায় রূপান্তরিত হলো, কারণ আমরা তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যটা বুঝতে পেরেছিলাম।
আসলে গুগল শুধু আপনার পণ্যের বর্ণনা দেখে না, সে ব্যবহারকারী কী জানতে চাচ্ছে, সেটাও বোঝে। যদি আপনার কন্টেন্ট ব্যবহারকারীর ইনটেন্টের সাথে না মেলে, তাহলে গুগল সেই পেজটিকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, ফলে আপনার র্যাঙ্কিং কমে যায়, আর সাইটে ট্রাফিকও আসে না। এই ধরনের “থিন কন্টেন্ট” (যেখানে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না) বা ভুল কন্টেন্ট থাকার কারণে বাউন্স রেট বেড়ে যায়, অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা দ্রুত সাইট ছেড়ে চলে যায়।
যেমন, কেউ যখন “সেরা বাজেট ফোন” লিখে সার্চ করে, তখন তারা শুধু ফোনের স্পেসিফিকেশন চায় না; তারা তুলনা, রিভিউ বা সুপারিশ চায়। আমাদের দেশে যেখানে মোবাইল থেকেই বেশিরভাগ ই-কমার্স ট্রাফিক আসে (প্রায় ৮০% কেনাকাটা মোবাইল থেকেই হয়), সেখানে এমন অপ্রাসঙ্গিক কন্টেন্ট পেয়ে গেলে গ্রাহকরা খুব দ্রুত হতাশ হয়ে ফিরে যায়। আপনার ব্যবসার জন্য এটা অনেক বড় ক্ষতি, কারণ বাংলাদেশ ই-কমার্স মার্কেট ২০২৪ সালে প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার হওয়ার সম্ভাবনা আছে, আর ২০২৯ সালের মধ্যে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা প্রায় ১.৬ কোটি হতে পারে। এই বিশাল বাজারে টিকে থাকতে হলে গ্রাহকের প্রতিটি সার্চ ইনটেন্টকে সম্মান জানানো খুব জরুরি।
এই ইনটেন্টগুলো বোঝা এবং সে অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করা কিন্তু সবসময় সহজ নয়। লেনদেনমূলক (যেমন “টি-শার্ট কিনুন”), তথ্যমূলক (যেমন “টি-শার্ট কিভাবে স্টাইল করবেন”), নেভিগেশনাল (যেমন “দারাজ টি-শার্ট”) আর বাণিজ্যিক অনুসন্ধান (যেমন “সেরা সুতির টি-শার্ট রিভিউ”) – এই প্রতিটি ইনটেন্টের জন্য আলাদাভাবে কন্টেন্ট সাজানো বেশ সময়সাপেক্ষ। অনেক সময় আমরা শুধুমাত্র ‘বিক্রি’ করার দিকে এতটাই মনোযোগ দেই যে, ব্যবহারকারীর ‘জানা’ বা ‘বোঝা’র প্রয়োজনটাকে ভুলে যাই।
আপনি যদি আপনার ই-কমার্স ব্যবসাকে শুধু পণ্য বিক্রেতা হিসেবে না দেখে একজন তথ্য প্রদানকারী বা সমস্যা সমাধানকারী হিসেবেও উপস্থাপন করতে চান, তাহলে এই বিষয়টি আপনার জন্য খুবই জরুরি। এটা আপনাকে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সাথে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা তৈরি করবে।
৭. কিওয়ার্ড গবেষণার অভাব (Lack of Keyword Research (Buying intent and conversion))
কিওয়ার্ড গবেষণাটা বলে দেয় আপনার সম্ভাব্য গ্রাহকরা আপনাকে ঠিক কোথায় খুঁজছেন, আর কী কিনতে চাইছেন!
একটি নতুন কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স বিক্রেতা স্টার্টআপের সাথে কাজ করার সময় এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলাম। তাদের ওয়েবসাইটে “রান্নার সরঞ্জাম” এর মতো খুব সাধারণ কিছু শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছিল। এতে ট্রাফিক তো ছিলই না, বিক্রিও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, যেন আপনার দোকানে দারুণ সব জিনিস আছে, কিন্তু ক্রেতারা জানেই না দোকানে ঢোকার পথ কোনটা! আমরা তখন বসে বিস্তারিত কিওয়ার্ড গবেষণা করলাম। খুঁজছিলাম এমন সব শব্দ যা মানুষ কেনার উদ্দেশ্য নিয়ে সার্চ করে। আর তাতেই পেলাম “সিঙ্গেল বার্নার গ্যাস স্টোভ দাম” বা “নন-স্টিক তাওয়া অনলাইন বিডি” এর মতো দারুণ সব দীর্ঘ-লেজের (long-tail) কিওয়ার্ড। যখন এই নির্দিষ্ট কিওয়ার্ডগুলোকে ধরে আমরা ওয়েবসাইট অপ্টিমাইজ করলাম, তখন ম্যাজিকের মতো কাজ হলো! উপযুক্ত ট্রাফিক আসা শুরু করলো, যারা সরাসরি পণ্য কিনতে প্রস্তুত ছিল। বিশ্বাস করুন, তখন তাদের বিক্রি এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, শুধু কিওয়ার্ড টার্গেট করলেই হবে না, বুঝতে হবে আপনার গ্রাহক ঠিক কী উদ্দেশ্যে খুঁজছেন। যেমন ধরুন, কেবল “জুতা” না খুঁজে, মানুষ হয়তো “ব্রাউন লেদার লোফার জুতা অনলাইন” বা “ঢাকায় সস্তায় রান্নার গ্যাস স্টোভ” লিখে সার্চ করছে। এই লম্বা-লেজের কিওয়ার্ডগুলো (long-tail keywords) যদিও কম মানুষ সার্চ করে, কিন্তু যারা করে, তাদের কেনার উদ্দেশ্য অনেক বেশি থাকে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটা করা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.০৭ কোটি, আর ২০২৯ সাল নাগাদ এটা বেড়ে ১.৫৯ কোটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভাবুন তো, এতো বড় একটা বাজার, আর যদি আপনি না জানেন গ্রাহকরা ঠিক কী লিখে খুঁজছে, তাহলে তো অনেক বড় একটা সুযোগ হারাবেন, তাই না? গুগল কিওয়ার্ড প্ল্যানার, Ahrefs বা Semrush-এর মতো টুলস ব্যবহার করে আমরা এই কিওয়ার্ডগুলো খুঁজে নিতে পারি, যদিও বাংলার জন্য স্থানীয় ধারণাগুলো দারুণ কাজে আসে।
কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের অনেক ই-কমার্স সাইট এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বই দেয় না। তারা হয়তো শুধু “টি-শার্ট” বা “মোবাইল” এর মতো খুব সাধারণ, আর অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কিওয়ার্ডগুলোকে টার্গেট করে বসে থাকে। এতে কী হয় জানেন? তাদের ওয়েবসাইট হয়তো সার্চ রেজাল্টে উপরের দিকে আসেই না, বা এলেও যারা আসে তারা কিনতে আসেনি, শুধু তথ্য খুঁজছে। আর এতে করে তাদের ব্যবসার অনেক মূল্যবান সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।
আমার মনে হয়, আপনি যদি আপনার ই-কমার্স ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে চান এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চান, তাহলে কেনার উদ্দেশ্য (buying intent) বুঝে কিওয়ার্ড গবেষণা করাটা খুবই জরুরি। এটা আপনার সাইটে শুধু ট্রাফিকই আনবে না, আসল ক্রেতাও এনে দেবে।
৮. স্টক-আউট বা মৌসুমী পণ্যের জন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকা (No Plan for Out-of-Stock or Seasonal Products)
কোনো অনলাইন সাইটে পছন্দের জিনিস খুঁজতে গিয়ে দেখেন যে সেটি স্টকে নেই, কিন্তু সাইট টি আপনাকে হতাশ না করে অন্য কোনো পথ দেখাচ্ছে, তখন দারুণ লাগে। একটা গুছানো প্রোডাক্ট লাইফসাইকেল থাকলে কাস্টমাররা কখনও মনে করেন না যে তারা একটা ডেড এন্ডে এসে পড়েছেন, বরং তারা একটা ভালো অভিজ্ঞতা পান।
একটি পোশাকের দোকানে কাজ করার সময় একটি বিষয় চোখে পড়েছিল। তারা বসন্তকালে সব শীতের পোশাকের পেজগুলো স্রেফ ডিলিট করে দিত। ভাবুন তো, শত শত 404 এরর! গুগল এসে দেখতো পেজগুলো নেই, কাস্টমাররাও খালি হাতে ফিরতো। পরের বছর যখন আবার একই ধরনের প্রোডাক্ট আসতো, তখন তাদের জন্য নতুন করে পেজ তৈরি করতে হতো। এতে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া সেই পেজগুলোর SEO অথরিটি, অর্থাৎ গুগলের কাছে তাদের গুরুত্ব, পুরোটাই নষ্ট হয়ে যেত। এর বদলে, যদি আমরা সেই পেজগুলোকে একই ক্যাটাগরির অন্য কোনো পেজে (301 রিডিরেক্ট করে) অথবা ‘স্টক এলেই আমাকে জানান’ এমন একটা অপশন দিয়ে রাখতাম, তাহলে কাস্টমারদের জন্য যেমন সুবিধা হতো, তেমনি গুগলের কাছেও সাইটটা নির্ভরযোগ্য থাকতো। এটা আপনার ইনভেন্টরির SEO লাইফস্প্যানটা চমৎকারভাবে পরিচালনা করার একটা উপায়।
বাংলাদেশে ই-কমার্স বাজার তো বিশাল গতিতে বাড়ছে, ২০২৪ সাল নাগাদ প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার আর ২০২৯ সাল নাগাদ তা প্রায় ১২.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা। এত বড় একটা বাজারে, গ্রাহকদের ভালো অভিজ্ঞতা দেওয়াটা খুব জরুরি। যখন কোনো পেজ ডিলিট হয়ে যায় বা ৪0৪ এরর দেখায়, তখন শুধু যে কাস্টমার হতাশ হন তা নয়, গুগলের কাছেও সাইটের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। এটা আপনার সাইটের নেভিগেশনাল ইউএক্সকে খারাপ করে দেয়, যা বাউন্স রেট বাড়াতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত আপনার বিক্রি কমিয়ে দেয়। কারণ গুগল সেই পেজগুলোকে ‘থিন কন্টেন্ট’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভেবে আপনার র্যাঙ্কিং কমিয়ে দিতে পারে, যেমনটা দুর্বল ক্যাটাগরি পেজের ক্ষেত্রে ঘটে। মনে রাখবেন, মোবাইল থেকে ৮০% কেনাকাটা হয়, তাই মোবাইলে যেন ৪0৪ না আসে, সেদিকে খেয়াল রাখাটা আরও বেশি জরুরি।
অনেক ই-কমার্সই এই দিকটা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। পণ্য স্টক-আউট হলেই তারা পেজটা মুছে ফেলে বা স্রেফ একটা “পণ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি” বার্তা দেখিয়ে দেয়। এটা শুধু একটা সাময়িক ভুল নয়, এটা আপনার ব্যবসার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি, কারণ এর ফলে সেই পেজগুলোর এত দিনের তৈরি হওয়া SEO অথরিটি মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।
তাই, আপনি যদি চান আপনার ই-কমার্স সাইটটি শুধুমাত্র বর্তমান গ্রাহকদের ধরে রাখতে নয়, বরং গুগলে তার অবস্থান মজবুত রাখতে, তাহলে স্টক-আউট বা মৌসুমী পণ্যের জন্য একটা ভালো পরিকল্পনা থাকা খুব জরুরি। স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া পণ্যের জন্য 301 রিডিরেক্ট ব্যবহার করা, আর সাময়িকভাবে স্টক-আউটের জন্য পেজটি রেখে স্ট্যাটাস আপডেট করা এবং বিকল্প পণ্যের বা ‘আমাকে জানান’ অপশন দেওয়া – এই কৌশলগুলো আপনার ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য দারুণ কাজ করতে পারে।
৯. টেকনিক্যাল SEO এর মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করা (Ignoring Technical SEO Basics)
টেকনিক্যাল এসইও একটা সাইটের জন্য খুবই জরুরি। এটা না থাকলে, একটা সাইট সার্চ ইঞ্জিন থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
একটা সাইটে মোবাইল নেটওয়ার্কে লোড হতে এটা প্রায় ৮-১০ সেকেন্ড সময় নিলে খুব কমই ধৈর্য থাকবে এমন একটা সাইটে অপেক্ষা করার! গুগল সার্চ কনসোলে যখন আমরা তাদের কোর ওয়েব ভাইটালস (Core Web Vitals) রিপোর্ট দেখলাম, সাইটটা একদম লাল দাগে ছিল। এর মানে হলো, গুগলের চোখে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা একদমই ভালো ছিল না।
একটা ওয়েবসাইট লোড হতে যদি ৩ সেকেন্ডের বেশি সময় নেয়, তাহলে ব্যবহারকারীরা প্রায় ৪০% বেশি হারে সাইট ছেড়ে চলে যান। বাংলাদেশে মোট ই-কমার্স লেনদেনের ৮০% হয় মোবাইল থেকেই, যদি সাইট মোবাইলে ধীরে লোড হয়, ব্যবহারকারীরা হতাশ হয়ে ফিরে যেতে পারে, এতে ট্যাফিক আসলেও বিক্রি বাড়ে না।
পেজ লোডিং স্পিড, যা টেকনিক্যাল SEO এর একটা বড় অংশ, সেটা ই-কমার্সের জন্য ভীষণ জরুরি। গবেষণা বলছে, একটা ওয়েবসাইট যদি ৩ সেকেন্ডের বেশি লোড হতে সময় নেয়, তাহলে গ্রাহকদের বাউন্স করার সম্ভাবনা প্রায় ৪০% বেড়ে যায়! আর বাংলাদেশে যেহেতু ই-কমার্সের প্রায় ৮০% লেনদেন মোবাইল ডিভাইস থেকে হয়, তাই মোবাইল নেটওয়ার্কের কথা মাথায় রেখে সাইটের গতি বাড়ানোটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। Core Web Vitals (যেমন LCP, FID, CLS) পরীক্ষা করা, ছবি অপ্টিমাইজ করা, ব্রাউজার ক্যাশিং ও CDN ব্যবহার করা, robots.txt এবং XML সাইটম্যাপ সঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করা — এই বিষয়গুলো গুগল সার্চ কনসোলের মাধ্যমে নিয়মিত দেখা উচিত।
টেকনিক্যাল এসইও দেখতে হয়তো খুব আকর্ষণীয় মনে নাও হতে পারে। এর কাজগুলো হয়তো একটু জটিল আর অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে, যার জন্য একটু ধৈর্যের প্রয়োজন। অনেক সময় এটা উপেক্ষিত থাকে কারণ এর তাৎক্ষণিক ফলাফলটা চোখে পড়ে না, কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে।
আপনার ই-কমার্স সাইটে ট্রাফিক আসছে কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না, অথবা গুগল আপনাকে ঠিকমতো খুঁজে পাচ্ছে না, তাহলে এই দিকটা আপনাকে অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে। আপনার সাইটের লোডিং স্পিড, ক্রল ত্রুটি, ভাঙা লিঙ্ক, robots.txt ফাইল বা XML সাইটম্যাপ ঠিক আছে কিনা – এই সব মৌলিক টেকনিক্যাল দিকগুলো আপনার অনলাইন ব্যবসার মেরুদণ্ড। এগুলো ঠিক না থাকলে, অন্য সব চেষ্টা বৃথা যাবে।
১০. মোবাইল SEO কে অগ্রাধিকার না দেওয়া (Not prioritizing mobile SEO)
মোবাইল SEO-কে অগ্রাধিকার না দেওয়াটা ই-কমার্স ব্যবসার জন্য একটা বড় ভুল, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে। একটা মোবাইল-বান্ধব সাইট ব্যবহার করা ঠিক যেন আপনার কাজের জন্য সঠিক টুলটা খুঁজে পাওয়ার মতো সবখানেই, সব পরিস্থিতিতেই এটা আপনার কাজে আসে আর দারুণ একটা অভিজ্ঞতা দেয়।
আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলি। একবার আমি আমার ফোন থেকে একটি অনলাইন স্টোর থেকে উপহার কিনতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পণ্যের ছবিগুলো অবিশ্বাস্যভাবে ধীরে লোড হচ্ছিল, “অ্যাড টু কার্ট” বাটনটি ছিল এত ছোট যে ট্যাপ করা কঠিন, আর চেকআউট ফর্মে বারবার জুম ইন-আউট করতে হচ্ছিল! আমি সত্যিই হতাশ হয়ে কিছু না কিনেই বেরিয়ে এসেছিলাম। এই অভিজ্ঞতাটা কিন্তু বাংলাদেশে খুব সাধারণ একটা ব্যাপার, আর এটাই আপনার সম্ভাব্য একজন গ্রাহককে হারাতে পারে।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, যখন একটা সাইট মোবাইলে ঠিকমতো কাজ করে না, তখন গ্রাহকরা দ্রুত হতাশ হয়ে ফিরে যান। এখন, আপনি জানেন তো, বাংলাদেশ কিন্তু আসলে একটা ‘মোবাইল-প্রথম’ দেশ। গুগল সার্চের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের ই-কমার্স লেনদেনের ৮০ শতাংশই আসে মোবাইল ডিভাইস থেকে! এমনকি, ২০২৫ সালের শুরুতে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন মোবাইল সংযোগ সক্রিয় ছিল, যা আমাদের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এর মানে, মোবাইলের মাধ্যমে কেনাকাটা করার প্রবণতা এখানে ব্যাপক। তাই আপনার সাইট যদি মোবাইলে ভালো না হয়, তাহলে আপনি বাংলাদেশের কত বিশাল সংখ্যক সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন! গুগলও মোবাইল-ফার্স্ট ইনডেক্সিং করে, মানে তারা আপনার সাইটের মোবাইল সংস্করণটাকেই ইনডেক্সিং আর র্যাঙ্কিংয়ের জন্য প্রধান হিসেবে দেখে। যদি আপনার সাইট মোবাইল স্ক্রিনে দ্রুত লোড না হয়, বা বাটনগুলো ছোট হয়, বা টেক্সট পড়তে অসুবিধা হয়, তাহলে কিন্তু ব্যবহারকারীরা বেশিক্ষণ থাকেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, একটা সাইট লোড হতে যদি ৩ সেকেন্ডের বেশি সময় নেয়, তাহলে ৪০% এর বেশি ভিজিটর সাইট থেকে ফিরে যান।
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে মোবাইল SEO নিখুঁত করাটা একটা চলমান কাজ। একবার করে ফেললেই যে শেষ, তা কিন্তু নয়। প্রযুক্তির সাথে সাথে আপনাকেও সব সময় সাইটটা বিভিন্ন ডিভাইসে পরীক্ষা করতে হবে, লোডিং স্পিড ঠিক আছে কিনা দেখতে হবে, আর নিশ্চিত করতে হবে যেন নেভিগেশন সব সময় সহজ থাকে। হয়তো শুরুর দিকে একটু সময় আর মনোযোগ বেশি দিতে হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই বিনিয়োগটা আপনার ব্যবসার জন্য খুবই জরুরি।
যদি আপনি বাংলাদেশের বিশাল মোবাইল ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে চান এবং আপনার অনলাইন বিক্রি বাড়াতে চান, তাহলে মোবাইল SEO-কে কোনোভাবেই অবহেলা করা ঠিক হবে না। আপনার উচিত একটা রেসপনসিভ ডিজাইন নিশ্চিত করা, মোবাইল লোডিং স্পিড বাড়ানো, সহজে ট্যাপ করা যায় এমন বাটন রাখা এবং সুস্পষ্ট টেক্সট ও সহজ নেভিগেশন যোগ করা। গুগলের মোবাইল-ফ্রেন্ডলি টেস্ট টুলটা ব্যবহার করে আপনার সাইট কেমন কাজ করছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা আপনার জন্য খুবই কাজের হবে। আমার মনে হয়, যারা নিজেদের অনলাইন ব্যবসাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে চান, তাদের জন্য এই দিকটা মনোযোগ দিয়ে দেখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. ভুল বা অতিরিক্ত কিওয়ার্ড ব্যবহার (Keyword Stuffing or Irrelevant Keywords)
আমার কাছে মনে হয়, এটা সবচেয়ে কমন ভুল। অনেকে ভাবে, যত বেশি কিওয়ার্ড ব্যবহার করবে, গুগল তত বেশি দেখাবে। যেমন, একটা সাধারণ টি-শার্টের বর্ণনায় হয়তো ‘টি-শার্ট, বেস্ট টি-শার্ট, সস্তায় টি-শার্ট, আরামদায়ক টি-শার্ট, ফ্যাশনেবল টি-শার্ট, ঢাকাই টি-শার্ট, পুরুষদের টি-শার্ট…’ – এভাবে একগাদা কিওয়ার্ড ঠেলে দেয়। ব্যাপারটা হলো, গুগল কিন্তু এখন অনেক স্মার্ট। সে শুধু কিওয়ার্ড দেখে না, আপনার লেখাটা কতটা প্রাসঙ্গিক আর সহজবোধ্য সেটাও দেখে। যখন আপনি অপ্রাসঙ্গিক বা অতিরিক্ত কিওয়ার্ড ব্যবহার করেন, তখন গুগল আপনার ওয়েবসাইটকে ‘স্প্যামি’ মনে করে এবং আপনার র্যাঙ্কিং কমিয়ে দেয়।
১২. স্থানীয় SEO উপেক্ষা করা (Ignoring Local SEO)
বাংলাদেশে ই-কমার্স বলতে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন শহর বা অঞ্চলের গ্রাহকরাও যুক্ত। আপনি যদি আপনার পণ্যের ডেলিভারি শুধু নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দেন বা আপনার টার্গেট কাস্টমার নির্দিষ্ট কোনো এলাকার হন, তাহলে স্থানীয় (Local SEO Service)আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ‘খুলনার সেরা মিষ্টি’ বা ‘সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি’ – এই ধরনের কিওয়ার্ড দিয়ে আপনার পণ্যকে র্যাঙ্ক করানো যায়।
১৩. ব্যাকলিংক তৈরির অভাব (Lack of Quality Backlinks)
আমার কাছে ব্যাকলিংকগুলো হলো আপনার ওয়েবসাইটের প্রতি অন্য ওয়েবসাইটের ‘ভোট’। যত বেশি স্বনামধন্য ওয়েবসাইট আপনার সাইটের দিকে লিংক দেবে, গুগলের চোখে আপনার ওয়েবসাইট তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে। অনেকেই ব্যাকলিংক নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না বা ভুলভাল ওয়েবসাইট থেকে লিংক তৈরি করেন, যা হিতে বিপরীত হয়। একটা শক্তিশালী ব্যাকলিংক প্রোফাইল আপনার সাইটের অথরিটি বাড়াতে সাহায্য করে।
১৪. অ্যানালিটিক্স ব্যবহার না করা (Not Using Analytics)
আমার মতে, ব্যবসা করছেন কিন্তু কোথায় ভুল হচ্ছে বা কোনটা ঠিক চলছে, তা জানছেন না – এটা তো অন্ধকারে তীর ছোঁড়ার মতো। গুগল অ্যানালিটিক্স বা অন্য কোনো টুল ব্যবহার করে আপনার ওয়েবসাইটে কারা আসছে, কোথা থেকে আসছে, কোন পণ্যে বেশি ক্লিক করছে, কতক্ষণ থাকছে – এই তথ্যগুলো জানা জরুরি। এই ডেটাগুলো আপনাকে আপনার ভুলগুলো চিহ্নিত করতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। অথচ আমি দেখেছি, অনেকে হয়তো ইনস্টলই করে রেখেছেন কিন্তু ডেটা দেখেন না!
বাংলাদেশে SEO ভুল সম্পর্কিত FAQ
কেন পর্যাপ্ত ট্রাফিক থাকা সত্ত্বেও ই-কমার্স বিক্রয় বাড়ছে না?
সাইটের কাঠামো অগোছালো, ক্যাটাগরি পেজ ফাঁকা, প্রোডাক্ট বর্ণনা দুর্বল, মোবাইল গতি কম, আর ইনটেন্ট না মিললে ট্রাফিক কনভার্ট হয় না।
ফাঁকা বা দুর্বল ক্যাটাগরি পেজ কীভাবে বিক্রি কমায়?
ক্যাটাগরি পেজে বর্ণনা, সুবিধা, ফিল্টার-গাইড, ইন্টারনাল লিংক না থাকলে গুগল পাতলা কন্টেন্ট ধরে, র্যাঙ্কিং পড়ে, ক্রেতা দ্রুত বেরিয়ে যায়।
ডুপ্লিকেট প্রোডাক্ট বর্ণনা ও ভ্যারিয়েন্ট পেজে বড় ক্ষতি কোথায়?
একই বর্ণনা বহু পেজে দিলে গুগল কনফিউজড হয়, কোনটা র্যাঙ্ক করবে বুঝে না। ক্যানোনিকাল/ইউনিক কপি না থাকলে সেলস থামে।
ফিল্টার/প্যারামিটার URL বেশি ইনডেক্স হলে SEO কেন নষ্ট হয়?
ব্র্যান্ড, দাম, রঙ ফিল্টার থেকে অসংখ্য URL ইনডেক্স হলে ক্রল বাজেট নষ্ট হয়, ইনডেক্স ব্লট হয়, মূল ক্যাটাগরি/প্রোডাক্ট পেজ র্যাঙ্ক হারায়।
আউট-অফ-স্টক বা মৌসুমী পেজ ডিলিট করলে কী সমস্যা হয়?
পেজ ডিলিট করলে 404 বাড়ে, অথরিটি নষ্ট হয়, ফিরে আসা ট্রাফিক হারায়। স্টক স্ট্যাটাস আপডেট, বিকল্প সাজেশন, 301 রিডাইরেক্ট রাখুন।
উপসংহার
দীর্ঘমেয়াদে ইকমার্সের স্থিতিশীলতা ভিজিটরের সংখ্যার ওপর নয়, ক্রয়ের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। অমীমাংসিত ঘাটতিগুলো একসাথে হলে বাংলাদেশে একটি SEO ভুল ব্যবসার বিস্তার সীমিত করে। যারা AI সার্চ অপ্টিমাইজেশন ও নিয়মিত মূল্যায়নে বিনিয়োগ করে, তারা বিশ্বাস, দৃশ্যমানতা ও আয় সুরক্ষিত রাখে। এখনই একটি লক্ষ্যভিত্তিক অডিট দিয়ে শুরু করে দৃঢ় পদক্ষেপ নিন।


